থাইল্যান্ড ভ্রমন - ব্যাংকক (Thailand Visit - Bangkok City)
#ব্যাংককঃ
সাদা হাতির দেশ থাইল্যান্ড। তার রাজধানী ব্যাংকক। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান ফিফি, ক্রাবি, জেমস বন্ড আইল্যান্ড বা ফুকেট হলেও কোন দেশের রাজধানী না দেখলে সেই দেশ ঘুরা অসম্পূর্ণ রয়ে যায় বলে আমি মনে করি।
এখানে এয়ারপোর্ট দুইটা। বাজেট এয়ারে আসলে ডন মুয়াং এ নামাবে আর না হলে সুবর্নভূমি। এখানে নামলেই আপনাকে স্বাগত জানাবে একরাশ অর্কিড ফুল, সারা বছর কিভাবে এই অর্কিড গাছে ফুল ধরে থাকে সেটাই রহস্য। এয়ারপোর্ট এ নেমে "এয়ারপোর্ট রেল লিং সিটি লাইন" এ শহরে যাওয়া যায়। এছাড়া বাস ও টেক্সি সার্ভিস আছে।সুবর্নভূমি থেকে টেক্সিতে ভাড়া নিয়েছিল ৪০০ বাথ।
ব্যাংকক এ রোড মুভের পাশাপাশি স্কাই ট্রেন (বিটিএস) আর আন্ডারগ্রাউন্ড (এমআরটি) আছে।শহরের মোটামুটি দর্শনীয় সব জায়গায় এগুলোর স্টেশন আছে। খুব অল্প খরচে এগুলোতে দ্রুত যাওয়া যায়। তাই থাইল্যান্ড যাবার আগে ট্রেনের রুট ম্যাপ ডাউনলোড করে নিয়ে যেতে হবে। আর একটু কস্ট করে ম্যাপটা বুঝতে হবে। একবার বুঝলে দেখবেন তা পানির মতো সহজ।
এছাড়া এখানে টেক্সি সার্ভিস আছে। এছাড়া আছে টুক টুক। এগুলো আবার আজব। কারন অনেক সময় তুলনামূলকভাবে অনেক কম ভাড়ায় যাবে, কিন্তু শর্ত থাকবে পথে কোন এক নির্দিষ্ট শপিং এর দোকান ঘুরে যেতে হবে। ওই মলে গেলেই মল থেকে তাদের কমিশন দেয়া হয়, আর কিছু কিনলে তারা আরো বেশি কমিশন পায়। তাই আপনার আর তার দুজনেরই লাভ।
হোটেল পাওয়া যাবে সুকুমভিত এর নানা এলাকায় 'ম্যাক্সিম ইন' এর মত কমের মধ্যে। বিটিএস নানা স্টেশন থেকে মিনিটখানেকের হাঁটা পথ। হোটেল নির্বাচনের সময় তা যেন কোন বিটিএস বা এমআরটি স্টেশনের কাছাকাছি থাকে তা দেখে নেয়া জরুরি।
সুকুমভিত এলাকায় থাইল্যান্ডের বিখ্যাত হাসপাতাল বামরুনগ্রাদ আছে। যেখানে বাংলাদেশ সহ অনেক দেশের লোকজন চিকিৎসা নিতে যায়। এখানে থাকার বড় কারন, এখানে হাঁটা দুরত্বে বাংলা খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। আমরা খেতাম 'আল হোসাইন' রেস্টুরেন্টে। খাবার অনেকগুলো করে দেয়, ফলে ৪ জনের দল গেলে সুবিধা, আর একা গেলে এক জনকে অনেক বেশি খাবার নিতে হয় ও অপচয় হয়।
ব্যাংকক এলাকায় পাতায়া বা ফুকেটের মতোই একটু পর পর ম্যাসেজ পার্লার, বার, ড্যান্স ক্লাব ইত্যাদি আছে। সন্ধা থেকেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্বল্পবসনা মেয়েরা 'বিশেষ' উদ্দেশ্য দাঁড়িয়ে থাকে। আর কেউ কেউ থাকবে ম্যাসাজের বিভিন্ন 'মেন্যু' এর কাগজ নিয়ে। ফুট পাথে অনেক ছোট-খাট দোকানের পশরা সাজিয়ে বিক্রেতারা বসে থাকে। সেখানে অনেক আজব আজব জিনিস কিনতে পাওয়া যায়, যা দেখলে যে কারো চক্ষু চরকগাছ হয়ে যাবে।
ব্যাংকক হচ্ছে শপ্যালকোহলিক বা যারা শপিং করতে খুব পছন্দ করেন তাদের জন্য স্বর্গরাজ্য। এখানে হেন জিনিস নেই যা পাওয়া যায় না। আর দামও তুলনামূলকভাবে এতো সস্তা যে মনে হবে সব নিয়ে যাই।
ব্যংকক এ আরেকটা জিনিস যেটা মিস করার মতো নয় সেটা হল ফল। বিশেষ করে ড্রাগন ফল। অনেক ধরনের ফল আর তার জুস পাওয়া যাবে খুবই কম দামে।
ব্যাংকক এ ঘুরার জন্য অনেক জায়গা আছে। #সংক্ষেপে যায়গাগুলো হলঃ
♥ সিয়াম পার্ক - সাথে বাচ্চা থাকলে পুরা একটা দিন বরাদ্দ রাখা উচিত সিয়াম পার্ক এর জন্য। আমরা প্যাকেজ কিনেছিলাম। পিকআপ, ড্রপ, দুপুরে লাঞ্চ আর এন্ট্রি সহ সকল রাইড। বিশাল পার্ক, অত্যাধুনিক পার্কের মধ্যে যতগুলো রাইড থাকা সম্ভব তার সবগুলোই আছে। বাচ্চারা অনেক এনজয় করেছে। কিন্তু আমরা শরীরে যতদুর কুলায় বিভিন্ন রাইডে উঠার চেষ্টা করেছি। সবচেয়ে ভাল লেগেছে ওয়াটার রাইডগুলো আর ওয়েভ পুল।
♥ গ্রান্ড প্যালেস - এটি থাইল্যান্ডের রাজার পূর্বের সরকারি বাসভবন। প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো, খুবই সুন্দর জায়গা। অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি টুরিস্ট প্লেস। ডিসেন্ট কাপড় (লং প্যান্ট) পড়ে যেতে হয়। এন্ট্রি ফি ৫০০ বাথ। এখানে আমরা "Chao Phraya" নদী দিয়ে এক্সপ্রেস বোটে রিভার ক্রুজ করে গিয়েছিলাম, নেমেছিলাম "The Chang" ঘাটে, ওখান থেকে অল্প হেঁটে গ্রান্ড প্যালেস। আর ফিরেছিলাম টুকটুকে। ওখানে গেলে ছাতা নিয়ে যাবেন, নাইলে গরমে সিদ্ধ হতে যাবেন।
♥ সিয়াম প্যারাগন - একদিন আমরা গিয়েছিলাম সিয়াম পারাগন এ। এটা শুধু একটা শপিং কমপ্লেক্সই না, আরো অনেক কিছু আছে এখানে। ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পন্য ও ফুড কোর্ট আছে। এছাড়া মূভি থিয়েটার আছে।
♥ সি লাইফ একুরিয়াম - সিয়াম প্যারাগনে। সি লাইফের সাথে কম্বো টিকেটে আছে গ্লাস বোট রাইড, ৪ ডি মুভি ইত্যাদি। বিভিন্ন কম্বিনেশনের কম্বো টিকেট পাওয়া যায়। এখানে আসলে কোন দিক দিয়ে সময় কেটে যাবে টেরই পাবেন না। সি লাইফের নতুন জিনিসের মধ্যে পেঙ্গুইন দেখেছি। এন্ট্রি ফি ১,২০০ বাথ, কম্বো প্যাকেজ।
♥ মাদাম তুশো ওয়াক্স মিউজিয়াম - এখানে বিভিন্ন সেলিব্রিটিদের মোমের মূর্তি আছে। এগুলো এতো সুন্দর করে করা হয় যে হটাৎ দেখে মনে হবে সত্যিকার মানুষ। আগে না গিয়ে থাকলে এখানে অবশ্যই যেতে পারেন। এন্ট্রি ফি প্রায় ৬০০ বাথ।
♥ লুম্পিনী পার্ক - এটা একটা পার্ক। এখানে বিকেলে ঘুরতে খুব ভাল লাগবে। এখানে বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর ফুল, গাছ, পাখি ইত্যাদি আছে। শেষ বিকেলের দিকে গেলে দেখবেন, অনেক নারী-পূরুষ এখানে হাজির হয় এক্সারসাইজের জন্য। গানের সাথে সাথে অনেক মানুষ একত্রে এক্সারসাইজ করে। একদিন আপনিও সামিল হয়ে যান, ভালই লাগবে।
♥ চায়না টাউন - বিভিন্ন ধরনের স্ট্রিট শপিং এবং স্ট্রিট ফুড খেতে এখানে যেতে পারেন। এমআরটি তে যেতে পারবেন।
♥ ফ্লোটিং মার্কেট - 'Damnoen Saduak' ফ্লোটিং মার্কেট সবচেয়ে জনপ্রিয়। এখানে গেলে একসাথে 'Maeklong' রেলওয়ে মার্কেটেও যেতে পারেন। একটা সরু নালার ভেতরে এই ফ্লোটিং মার্কেট। এখানে বৈঠা বা ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করে বাজার করবেন। নদীর মধ্যে দোকান আবার নৌকার মধ্যেও দোকান। এখানে গেলে সকাল সকাল যেতে হবে, নইলে পরে নৌকাজট (যানজটের মতো) হয়। আর এক রেলওয়ে লাইনের দুইপাশে রেলওয়ে মার্কেট, ট্রেন আসলে সাথে সাথে মার্কেট বন্ধ করে ফেলে, আর ট্রেন চলে গেলে আবার দোকানের ঝাপি খুলে দেয়। এগুলো ব্যাংকক থেকে বেশ দুরে। বাসে যেতে হবে।
♥থাইল্যান্ড ভ্রমন - পাতায়া (Thailand Visit - Pattaya )
আমার মতে থাইল্যান্ড স্বল্প খরচে ঘুরার জন্য ও শপিং এর জন্য বেস্ট জায়গা। আর এক কথায় থাইল্যান্ডে সবকিছুই সহজলভ্য, এবং সেইফ। যার মন যা চায়, তাই সে পেতে পারে, তাই ভ্রমন পিপাসুদের গন্তব্যের তালিকায় থাইল্যান্ড সবসময় এক নাম্বারে থাকে।
এয়ার টিকেট যথারীতি যত আগে সম্ভব (প্রায় ২/৩ মাস) কাটতে হবে। অনেক এয়ারলাইন্স আছে। skyscanner dot net এই সাইট থেকে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন কোনটাতে কম। থাই লায়ন, থাই এয়ার, বিমান এগুলা সরাসরি যায়। জার্নি টাইম ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট। ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ১৮-২৫ হাজার টাকা। থাই লায়ন এ অনেক কম ভাড়া, প্রায় ১৪/১৫ হাজার এছাড়া আমাদের দেশী এয়ারলাইন্স রিজেন্ট ও ইউ এস বাংলা ত আছেই । আমি ব্যক্তিগতভাবে থাই লায়ন পছন্দ করি না।
ব্যাংকক এ এয়ারপোর্ট আছে দুইটা। শহর থেকে দুইটার দুরত্ব প্রায় একই। শুধু আগে ফুকেট গেলে কানেকটিং প্লেন কোন এয়ারপোর্ট থেকে ছাড়বে সেটা জানা জরুরি এবং সেভাবে জার্নি টাইম হিসেব করে ট্রানজিট নিতে হবে। ঢাকার সাথে সময়ের পার্থক্য ১ ঘন্টা।
ভিসার ঝামেলা নিতে না চাইলে কোন এজেন্সিকে দিয়ে করালে ভাল। ভিসা ফি প্রায় ৪০০০ টাকা, যেগুলো ডকুমেন্টস লাগবে তা হলঃ
√ পাসপোর্ট (৬ মাস মেয়াদ থাকতে হবে) এবং ২-৩ নং পাতার ফটোকপি
√ পূরুন করা ভিসা আবেদন ফর্ম
√ ন্যাশনাল আইডি এর কপি
√ পাসপোর্ট সাইজের (৩.৫ x ৪.৫ সেমি) ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড এ)
√ সলভেন্সি সার্টিফিকেট (১০০০ ডলার ব্যালেন্স)
√ ব্যাংক স্টেটমেন্ট (কমপক্ষে ৩ মাসের)
√ ওয়ার্ক / বিজনেস সার্টিফিকেট
√ কনফার্মড রিটার্ন টিকেট
√ হোটেল বুকিং
ভিসা করতে দেয়ার পর এম্বাসীর ফোন আসে। সেটা কোন ভাবেই মিস করা যাবেনা। হোটেল আগে বুকিং দিয়ে গেলে ভাল, ওখানে যেয়ে হোটেল দেখেও ভাড়া করতে পারেন তাতে সময় বেশী লাগে আর লং জার্নি করে গেলে সেই এনার্জি আর থাকেনা। হোটেলের জন্য আগোডা বা বুকিং ডট কম সাইট ভাল। সেখানে বাজেটসহ অনেক ধরনের ফিল্টারের অপশন আছে।
ডলার এর রেট পাতায়া বা ফুকেটে ব্যাংকক এর চেয়ে বেশী। এয়ারপোর্টে ভাংগালে কম পাবেন। কিছু থাই বাথ নিয়ে গেলে ভাল। ১ বাথ = ২.৭৫ টাকা প্রায় তবে দাম উঠানামা করে। সিম কিনবেন এয়ারপোর্ট থেকে। dtac প্রি পেইড সিম কার্ড ২৯৯ বাথ, ৮ দিন আনলিমিটেড ইন্টারনেট।
#পাতায়া
ব্যাংকক সুবর্নভূমি এয়ারপোর্ট থেকে পাতায়াগামী বাস পাওয়া যায় এছাড়া এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে টুকটকি যেটা আমাদের দেশে অটো বলে সেটা করে পাতায়া যাওয়ার বাসস্ট্যান্ডে চলে যেতে পারেন। বাংকক থেকে পাতায়া ভাড়া ৪০০-৫০০ বাথ এসি গাড়ি। ২ ঘন্টায় চলে যেতে পারবেন।
পাতায়া বিচে সমূদচেয়ার, কুশন ও ছাতা। ১০০ বাথ করে ভাড়া। একটু দুরে পারাসেইলিং এর সুযোগ আছে।
পাতায় থেকে যেতে পারেন #ফিফি দ্বীপ #কোরাল আইসলেন্ড সেখানে যাওয়ার জন্য স্পিড বোট, ফেরি আছে ফেরিতে ভাড়া ৩০ বাথ সময় লাগে ৩০-৪০মি সচ্ছ নীল পানির একটা দ্বীপ এখানে বিভিন্ন জিনিস দেখার আছে স্কুইড, সামদ্রিক চিংড়ি আরো অনেক কিছু স্পিড বোটে ভাড়া একটু বেশি।
পাতায়ার হার্ট বললে এটা হবে ওয়াকিং স্ট্রিট। ফ্রি লাইফ, যার যার মতো উপভোগ করতে এখানেই লোক সমাগম সবচে' বেশি হয়। লাইভ ড্যান্স শো, মিউজিক শো, নাইট ক্লাব, বার, ম্যাজিক শো, বার ড্যান্স, ম্যাসাজ সহ হরেক আয়োজন রয়েছে।
পাতায়াতে দেখার মতো আছে অনেক কিছু। এগুলোর অনেক কিছুই আবার ফুকেট আর ব্যাংককেও আছে। ব্যাংককে বা ফুকেটে দেখতে চাইলে পাতায়াতে না গেলেও হবে। যেমন, আর্ট ইন প্যারাডাইস, ফ্লোটিং মার্কেট, আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, টাইগার পার্ক ইত্যাদি। পাতায়াতে দর্শনীয় অন্যান্য জায়গাগুলো হলঃ
√ সেঞ্চুরি অব ট্রুথ - কাঠের তৈরি টেম্পল।
√ মিনি সিয়াম - বিশ্বের সব স্থাপনার রেপ্লিকা আছে।
√ নং নুছ ট্রপিক্যাল গার্ডেন - দক্ষিন এশিয়ার বৃহত্তম সুন্দর বোটানিক্যাল গার্ডেন।
√ রিপ্লিস বিলিভ ইট অর নট- ফান প্লেস এবং বিনোদনের স্থান।
√ সুখোয়াদি- বিশাল জায়গা জুড়ে এক চোখ ধাঁধানো রাজপ্রাসাদ।
√ বিগ বুদ্ধা টেম্পপল।


0 Comments